নড়াইলের একজন দেশ প্রেমিক রিজিয়া খাতুন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উজ্জ্বল রায় (নড়াইল জেলা) প্রতিনিধিঃ-       

ঔপনিবেশিক শাসনে অতিষ্ঠ। এ থেকে সবাই পরিত্রাণ চায়। পরিত্রাণ আন্দোলনের গতি প্রবাহে যেন নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি শিশুর জন্ম। 

উজ্জ্বল রায় নড়াইল জেলা প্রতিনিধি জানান, নড়াইলের ডুমুর তলা গ্রামে ৫ই কার্তিক ১৯৩৬ সালে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করে সে শিশুটিই হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে বেড়ে উঠতে থাকে নড়াইলের প্রত্যান্ত গ্রামের ধূলির ধূসরে।

শিশুটি এক বুক প্রত্যয় নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল পরাধিনতার নাগপাশ ছিন্ন করে মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত হবে একদিন। বাবা কমরেড নুরজালাল ছিলেন নড়াইলের তেভাগা আন্দোলনের একজন অবিসাংবাদিত নেতা। মা জিন্নাতুননেসা ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী।

মা বাবার হাত ধরেই পারিবারিক পরিবেশে লেখাপড়ায় হাতে খড়ি হয়েছিল। ১৯৪৬ সাল। চারিদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আান্দলোনের ডামাডোল। এদিকে তাকে নিয়ে মা বাবার অনেক বেশি আাশা। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই এই ছোট্ট শিশুটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। 

তারপর ১৯৪৭ সাল ব্রিটিশদের শাসন-শোষনের অবসান ঘটলেও এ দেশে এ জাতির ভাগ্যকাশে যেন দেখা দেয় নতুন করে দূর্যোগের ঘনঘটা। এ জাতি যেন হিংস্র বাঘের থাবা থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়ে দানবীয় কুমিরের গ্রাসে এসে পড়েছে। আমাদের প্রাণের ভাষা মায়ের ভাষাকে নিয়ে চক্রান্ত শুরু হয়। মাতৃভাষাকে নিয়ে নানামুখি চক্রান্ত এ ষড়যন্ত্রে তিনি হয়ে পড়েন উৎকণ্ঠিত। চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশার মধ্যো দিয়েও তিনি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকেন। 

১৯৪৮ সালের তেভাগা আন্দোলন বানচাল কারী ব্রিটিশ সরকারের দালাল নুরুল হুদাকে হত্যার দায়ে, ১৯৪৯ সালে পিতা কমরেড নুরজালাল গ্রেফতার হন। এ অবস্থায় তিনি ভেঙে না পড়ে পিতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে সামনের দিকে অগ্রসর হন। অতঃপর ১৯৫২ সাল এলো। মায়ের ভাষাকে রক্ষার মরনপণ লড়াইয়ে নেমে পড়েন তিনি।

মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও তার অশ্রু ধারায় যেন বইছে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের তাজা রক্ত। সে রক্তের শপথ নিয়ে দেশকে স্বাধীন করার যে বীজ ১৯৫২ তে রিজিয়া খাতুনেরা রোপন করে ছিলেন।

তারই ধারাবাহিকতায় তাঁরা বার বার গর্জে উঠেছেন ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে। ১৯৫৭ সালে দিলরুবা গার্ল্স স্কুল (বর্তমান নড়াইল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়) থেকে কৃতিত্বের সাথে এস, এস, সি পাস করেন। ১৯৫৮ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানির প্রস্তাবে যশোর জেলার নারিকেল বাড়িয়া গ্রামের এ্যাড.আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীর বাড়িতে গিয়েও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান।

১৯৬৩ সালে নড়াইল সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচ, এস, সি পাশ করেন। পাশাপাশি তার যে স্বপ্ন ছিল এলাকার মানুষকে তিনি শিক্ষিত করবেন। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌছে দিবেন। তা পুরণে ব্রতী হয়ে ওঠেন।

১৯৭০ সালে তার সে স্বপ্নযাত্রা শুরু হলো। তিনি নিজ গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। মা-বাবার আদরের রিজিয়া খাতুন হয়ে ওঠেন সকোলের প্রিয় রিজিয়া মাষ্টার। অবশেষে ১৯৭১ সাল। ৭-ই মার্চ, রেসকোর্সের জনোসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক। মুক্তির আহবানে যা কিছু ছিলো তাই নিয়ে রিজিয়া খাতুনেরা প্রস্তুত হলেন। প্রস্তুত করলেন অনেককে।

২৫-এ মার্চের কাল রাত্রীর আধারে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনির নৃশংসতার শোককে শক্তিতে পরিনতো করে প্রায় হাজারও স্বধীনতাকামী টগবগে তরুন-তরুনি একান্ত হয়ে ছিলেন রিজিয়া খাতুনের অনুভুতির সাথে দেশকে রক্ষা করবেন বলে। ২৫-শে মার্চ থেকে ১৬-ই ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস তাদের সহযোগীতা ছারাও মুক্তিযোদ্ধের কাছে, দেশের বাইরে ( কোলকাতা) থেকে আসা গোপন চিঠি পৌছে দিয়েছেন। মাতৃভূমিকে রক্ষা করার অতন্দ্র প্রহরি হিসাবে কাজ করেছেন রিজিয়া খাতুন।

তারপর আবার সেই স্বপ্ন। মানুষকে ঞ্জানের আলোয় উদ্ভাসিত করবেন বলে তিনি শিক্ষকতার সাথে সাথে নিজ অর্থ ব্যায়ে মানুষের ঞ্জান চর্চার জন্য একটি পাঠাগার স্থাপন করেন। বর্তমান নুরজালাল স্মৃতি পাঠগার নামে পরিচিত ও নড়াইল ডুমুরতলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি শহীদ মিনার স্থাপন করেন নিজ অর্থ ব্যায়ে।

দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ১৯৯৭ সালে তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসরে আসেন। দেশপ্রেমের যে অনন্য নজির তিনি রেখেছেন তা আজ অনুসরণীয় তার অনুজ, সহচর, সন্তান সকলের কাছে। ঞ্জানের যে শিক্ষা তিনি প্রজ্জ্বলিত করেছেন তা দীপ্যমান রেখেছেন তারই কর্মরত স্বনামধণ্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

এরই ধারাভাহিকতাই আজন্ম মেধাবী তার ৬ সন্তানেরা দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি তার জীবনদ্দশায় বিভিন্ন সমাজ সংস্কার মুলক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহন করেন। বর্তমান তিনি বসবাস করছেন নড়াইল শহরের মহিষখোলাতে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *